ঢাকাSaturday , 21 August 2021

কারবালার ঘটনা কি রাজতন্ত্রের অবৈধভতাকে সাব্যস্ত করে?

Link Copied!

নবী (সাঃ) এর প্রান প্রিয় দৌহিত্র হুসাইন ইবনে আলী (রাঃ) হলেন জান্নাতের যুবকদের সরদার। সুতরাং হুসাইন (রাঃ) তো বটেই, সকল সাহাবীদের প্রতি সুধারনা রাখা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের মৌলিক আদর্শ। তাই আমরা তাদের যেকোনো ভুলকে ইজতেহাদী ভুল বলে থাকি, কেননা তারা সর্বদা উম্মাহর কল্যাণের কথাই চিন্তা করেন, ব্যাক্তি স্বার্থ নয়।

নিঃসন্দেহে হুসাইন (রাঃ) ক্ষমতার লোভে কিংবা ব্যক্তি স্বার্থে কুফায় গমনের সিদ্ধান্ত নেননি। এক্ষেত্রে কপটতা লালনকারী কুফাবাসির পিড়াপিড়িতে তাদের কথার উপর ভিত্তি করে কুফায় গমন হুসাইন রা. এর কৌশলগতভাবে অদূরদর্শী একটি সিদ্ধান্ত ছিল বলেই সকল সাহাবীরা তাঁকে সেখানে যেতে বারন করেছিলেন। অবশ্য তিনি কুফায় যাওয়ার মাঝেই উম্মাহর অধিকতর কল্যাণ হবে বলে মনে করেছিলেন। আসুন ইমাম ইবনে কাসির প্রণীত “আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া” থেকে দেখা যাক, সাহাবীরা কিভাবে ও কেন তাকে ইরাক যেতে নিষেধ করেছিলেন। তাহলে আমাদের পক্ষে বিষয়টিকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবেঃ

১. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমারঃ
————————–
উমরাহ্ থেকে ফিরার পথে আবদুল্লাহ্ বিন উমর-আবদুল্লাহ্ বিন আব্বাস এবং ইব্ন আবু রাবীআ তাদের দু’জনের (হোসাইন এবং ইবনে যুবায়ের) সাথে আবওয়াতে’ সাক্ষাত করেন। তখন ইবন উমর (রা) তাদেরকে বললেন,
أُذَكِّرُكُمَا اللَّهَ إِلَّا رَجَعْتُمَا فَدَخَلْتُمَا فِي صَالِحِ مَا يَدْخُلُ فِيهِ النَّاسُ، وتنظرا فإن اجتمع الناس عليه فلم تشذا، وإن افترقوا عَلَيْهِ كَانَ الَّذِي تُرِيدَانِ.
“তােমাদেরকে আল্লাহর দোহাই যদি তােমরা তােমাদের মত থেকে না ফের এবং অন্য লােকেরা যে সঠিক ও সময়ােপযােগী বিষয়ে প্রবেশ করেছে তাতে প্রবেশ না কর, তাহলে অপেক্ষা কর, যদি লােকেরা তার (ইয়াযীদের) আনুগত্য স্বীকারে একমত হয়, তাহলে তােমরা দু’জন বিচ্ছিন্ন হয়ে থেকো না। আর যদি তারা তার আনুগত্যের ব্যাপারে বিচ্ছিন্ন ও বিভক্ত হয় তাহলে তােমদের অভিলাষ পূর্ণ হতে পারে।”

এরপর হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) আরও বলেন,
لَا تَخْرُجْ فَإِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَيَّرَهُ اللَّهُ بَيْنَ الدُّنيا وَالْآخِرَةِ فَاخْتَارَ الْآخِرَةَ، وَإِنَّكَ بَضْعَةٌ مِنْهُ وَلَا تَنَالُهَا – يَعْنِي الدُّنْيَا – وَاعْتَنَقَهُ وَبَكَى وَوَدَّعَهُ
“তুমি বের হয়াে না। কেননা, আল্লাহ্ তাঁর রাসূলকে দুনিয়া ও আখিরাতের যে কোন একটি বেছে নেওয়ার ইখতিয়ার দিয়েছেন। আর তিনি আখিরাতকে বেছে নিয়েছেন। আর তুমি তাঁরই দেহের একাংশ। সুতরাং তুমি তা (দুনিয়া) পাবে না। এরপর তিনি তাঁকে আলিঙ্গন করলেন এবং কাঁদতে কাঁদতে তাঁকে বিদায় জানালেন।

এরপর ইবন উমর (রা) বলতেন,
غَلَبَنَا حُسَيْنُ بْنُ عَلِيٍّ بِالْخُرُوجِ، وَلَعَمْرِي لَقَدْ رَأَى فِي أَبِيهِ وَأَخِيهِ عبرة، فرأى مِنَ الْفِتْنَةِ وَخِذْلَانِ النَّاسِ لَهُمَا مَا كَانَ ينبغي له أن لا يَتَحَرَّكَ مَا عَاشَ، وَأَنْ يَدْخُلَ فِي صَالِحِ مَا دَخَلَ فِيهِ النَّاسُ، فَإِنَّ الْجَمَاعَةَ خَيْرٌ.
হুসায়ন বিন আলী আমাদেরকে পরাজিত করে বেরিয়ে গেল। আমার সে তার পিতা ও ভাইয়ের মাঝে শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত প্রত্যক্ষ করেছিল। সে এমন বিপদ এবং মানুষের অসহযােগিতা প্রত্যক্ষ করেছিল, যার পর তার কর্তব্য ছিল সারাজীবন কোনরূপ নড়াচড়া না করা এবং লােকেরা যে সময়ােপযােগী সঠিক বিষয়ে প্রবেশ করেছিল তাতে প্রবেশ করা। কেননা, (যে কোন অবস্থায়) জামাআত তথা ঐক্য উত্তম।”

২. আবদুল্লাহ্ বিন আব্বাস (রাঃ)
————————–
ইবনে আব্বাস (রাঃ) তাকে বলেন,
لا تبرح الحرم فإنهم إن كانت بهم إليك حَاجَةٌ فَسَيَضْرِبُونَ إِلَيْكَ آبَاطَ الْإِبِلِ حَتَّى يُوَافُوكَ فَتَخْرُجَ فِي قُوَّةٍ وَعُدَّةٍ فَجَزَاهُ خَيْرًا وَقَالَ: أَسْتَخِيرُ اللَّهَ فِي ذَلِكَ.
তুমি হারামেই অবস্থান কর, তােমার কাছে যদি তাদের প্রয়ােজন থাকে তাহলে তারাই তােমার কাছে এসে হাযির হবে। তখন তুমি উপযুক্ত উপায়-উপকরণ ও শক্তি-সামর্থ্য নিয়ে বের হতে পারবে। তখন তিনি তাকে উত্তম বিনিময়ের জন্য দু’আ করলেন, এ ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করছি।

ইরাক অভিমুখে বের হওয়ার প্রাক্বালে ইবনে আব্বাস (রাঃ) তাকে বলেন,
وأين تريد يا بن فاطمة؟ فقال: العراق وشيعتي، فقال: إني لكاره لوجهك هَذَا تَخْرُجُ إِلَى قَوْمٍ قَتَلُوا أَبَاكَ وَطَعَنُوا أَخَاكَ حَتَّى تَرَكَهُمْ سَخْطَةً وَمَلَالَةً لَهُمْ؟ أُذَكِّرُكَ اللَّهَ أَنْ تَغْرُرَ بِنَفْسِكَ.
“হে ফাতিমার নন্দন ! তুমি কোথায় চলেছ? তখন তিনি বললেন, ইরাক অভিমুখে আমার অনুসারীদের কাছে। তখন তিনি বললেন, তােমার জন্য আমি এটা অপছন্দ করি। তুমি কি এমন এক গােষ্ঠীর কাছে যাচ্ছ, যারা তােমার পিতাকে হত্যা করেছে আর ভ্রাতাকে অন্যায় অভিযােগে অভিযুক্ত করেছে, ফলে তিনি ক্রোধ ও বিরক্তিতে তাদেরকে ত্যাগ করেছেন। আল্লাহর দোহাই। তুমি নিজের দ্বারা প্রতারিত হয়াে না।”

এরপর যাত্রা শুরু আগের দিন ইবনে আব্বাস (রাঃ) আবারো বলেন,
أنشدك أن تهلك غداً بحال مضيعة لا تأتي العراق، وإن كنت لابدَّ فاعلاً فأقم حَتَّى يَنْقَضِيَ الْمَوْسِمُ وَتَلْقَى النَّاسَ وَتَعْلَمَ مَا يُصْدِرُونَ، ثُمَّ تَرَى رَأْيَكَ، وَذَلِكَ فِي عَشْرِ ذِي الْحِجَّةِ. فَأَبَى الْحُسَيْنُ إِلَّا أَنْ يَمْضِيَ إِلَى الْعِرَاقِ
দোহাই তােমার ! (ইরাক অভিমুখে বের হয়ে) আগামীকাল তুমি ধ্বংসাত্মক অবস্থায় আত্মবিসর্জন দিও না। তুমি ইরাক যেও না। আর যদি তুমি ইরাক যেতেই চাও তাহলে হজ্জ মৌসুম শেষ হওয়া পর্যন্ত এখানে অপেক্ষা কর এবং লােকদের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের মনােভাব অনুমান কর। এরপর তুমি তােমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাে।
আর এটা ছিল যুল-হাজ্জাহর তারিখ। কিন্তু হুসায়ন (রা) তার ইরাক গমনের সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। তখন ইবন আব্বাস (রা) তাঁকে বললেন,
وَاللَّهِ إِنِّي لَأَظُنُّكَ سَتُقْتَلُ غَدًا بَيْنَ نِسَائِكَ وَبَنَاتِكَ كَمَا قُتِلَ عُثْمَانُ بَيْنَ نِسَائِهِ وَبَنَاتِهِ، وَاللَّهِ إني لأخاف أن تكون أنت الَّذِي يُقَادُ بِهِ عُثْمَانُ، فَإِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إليه راجعون.
আল্লাহর কসম! আমার প্রবল ধারণা হচ্ছে যে, হযরত উসমানের ন্যায় তুমিও কাল তােমার স্ত্রী কন্যাদের চোখের সামনে নিহত হবে। আল্লহর কসম! আমি আশঙ্কা করছি তােমাকে হত্যা করেই উসমান হত্যার বদলা নেয়া হবে। হায়! আমাদের দুর্ভাগ্য ! ইন্নালিল্লাহ্ ওইন্নাইলাইহি রাজিউন।

তখন হুসায়ন (রা) তাকে বললেন, হে আবুল আব্বাস ! আপনি বয়ােবৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তখন ইবন আব্বাস (রা) তাঁকে বললেন, যদি না আমার ও তােমার জন্য অবজ্ঞাজনক না হত, তাহলে আমি আমার হাত দিয়ে তােমার মাথা ঝাপটে ধরতাম। আর যদি আমি নিশ্চিত হতাম যে, তুমি অবস্থান করবে তাহলে আমরা তাই করতাম। কিন্তু আমি ধারণা করি না তা তােমাকে বিরত রাখবে।
এরপর ইবনে আব্বাস কেঁদে ফেলেন।

৩. আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ)
———————-
غلبني الحسين على الخروج، وقلت لَهُ: اتَّقِ اللَّهَ فِي نَفْسِكَ وَالْزَمْ بَيْتَكَ وَلَا تَخْرُجْ عَلَى إِمَامِكَ.
“ইরাক অভিমুখে বের হওয়ার ব্যাপারে হুসায়ন আমাকে পরাজিত করল। তখন আমি তাকে বললাম নিজের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজ গৃহে অবস্থান কর আর ইমামের (শাসকের) বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাে না।”

৪. আবূ ওয়াকেদী আল লায়ছীঃ
—————————
بَلَغَنِي خُرُوجُ الْحُسَيْنِ بْنِ عَلِيٍّ فَأَدْرَكْتُهُ بِمَلَلٍ فَنَاشَدْتُهُ اللَّهَ أَنْ لَا يَخْرُجَ فَإِنَّهُ يَخْرُجُ فِي غَيْرِ وَجْهِ خُرُوجٍ، إِنَّمَا خَرَجَ يَقْتُلُ نَفْسَهُ، فَقَالَ: لَا أَرْجِعُ.
“আমার কাছে হুসায়ন বিন আলী (রা)-এর রওনা হওয়ার সংবাদ পৌঁছল তখন আমি মালাল নামক স্থানে গিয়ে তাঁকে পেলাম। তখন আমি তাঁকে বের না হওয়ার অর্থাৎ আর অগ্রসর না হওয়ার জন্য আল্লাহর দোহাই দিলাম। কেননা, তিনি ভুল লক্ষ্যপানে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তিনি মূলত আত্মহুতির পথেই এগোচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন, আমি আর ফিরব না।”

৫. হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহঃ
كَلَّمْتُ حُسَيْنًا فَقُلْتُ: اتَّقِ اللَّهَ وَلَا تَضْرِبِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ، فَوَاللَّهِ مَا حُمِدْتُمْ مَا صَنَعْتُمْ فَعَصَانِي.
আমি হুসায়নকে বললাম, আল্লাহকে ভয় কর আর মানুষের একজনকে অন্যজন দ্বারা হত্যা করাে না। আল্লাহর শপথ! কিন্তু তিনি আমার কথা শুনলেন না।

৬. হযরত সায়ীদ ইবনুল মুসায়্যাবঃ
——————————
لَوْ أَنَّ حُسَيْنًا لَمْ يَخْرُجْ لَكَانَ خَيْرًا لَهُ.
“হুসায়ন যদি বের না হতেন, তাহলেই তাঁর জন্য তা কল্যাণকর হত।”

৭. আবু সালামা বিন আবদুর রহমান
—————————-
وقد كَانَ يَنْبَغِي لِحُسَيْنٍ أَنْ يَعْرِفَ أَهْلَ الْعِرَاقِ وَلَا يَخْرُجُ إِلَيْهِمْ
হুসায়নের উচিত ছিল ইরাকাবাসীকে চিনতে পারা এবং তাদের কাছে না যাওয়া।

৮. মিসওয়ার বিন মাখরামা
———————-
হযরত মিসওয়ার বিন মাখরামা হুসাইন (রাঃ)-কে পত্রে লিখেন,
إِيَّاكَ أَنْ تَغْتَرَّ بِكُتُبِ أَهْلِ الْعِرَاقِ
ইরাকবাসীদের পত্র দ্বারা প্রতারিত হয়াে না।

৯. উমরাহ্ বিনতে আবদুর রহমান
—————————
বিশিষ্ট আনসারি সাহাবী আসআদ বিন যুরারাহ (রাঃ) এর নাতনী এবং হযরত আয়িশা (রাঃ) এর স্নেহধন্য ছাত্রী উমরাহ্ বিনতে আবদুর রহমান তাঁকে পত্র লিখেন। তিনি তাকে শাসকের আনুগত্য এবং সকলের সাথে ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিলেন এবং তাঁকে জানালেন, যদি তিনি তা না করেন, তাহলে তিনি তার মৃত্যুস্থানের দিকেই চালিত হবেন।
এরপর তিনি (উমরাহ্ বিনতে আবদুর রহমান) বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি আয়েশা (রা)-কে বলতে শুনেছি যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলতে শুনেছেন, يُقْتَلُ الْحُسَيْنُ بِأَرْضِ بابل অর্থাৎ, বাবিল ভূখণ্ডে (ইরাকের ভুমিতে) হুসায়ন নিহত হবে।
তারপর হযরত হুসায়ন (রা) যখন তার পত্র পাঠ করলেন। তখন বললেন, فلابد لي إذا من مصرعي ومضى অর্থাৎ, তাহলে তাে অবশ্যই আমাকে আমার মৃত্যু স্থানে পৌঁছাতে হবে এরপর অগ্রসর হলেন।

১০. বকর বিন আবদুর রহমান বিন আল হারিস বিন হিশাম
———————————–
يا بن عم قَدْ رَأَيْتَ مَا صَنَعَ أَهْلُ الْعِرَاقِ بِأَبِيكَ وَأَخِيكَ، وَأَنْتَ تُرِيدُ أَنْ تَسِيرَ إِلَيْهِمْ وَهُمْ عَبِيدُ الدُّنْيَا،فَيُقَاتِلُكَ مَنْ قَدْ وَعَدَكَ أَنْ يَنْصُرَكَ، وَيَخْذُلُكَ مَنْ أَنْتَ أَحَبُّ إِلَيْهِ مِمَّنْ يَنْصُرُهُ، فَأُذَكِّرُكَ اللَّهَ فِي نَفْسِكَ.
হে চাচার ছেলে ! ইরাকবাসী আপনার পিতা ও ভাইয়ের সাথে কি আচরণ করেছে তা আপনি দেখেছেন, অথচ তারপরও আপনি তাদের কাছে যেতে চান। তারা তাে দুনিয়া পূজারী। আপনাকে সাহায্যের অঙ্গীকার করে তারাই আপনার সাথে যুদ্ধ করবে এবং আপনাকে ধোঁকা দিবে। তাই আল্লাহর দোহাই লাগে নিজের ব্যাপারে সতর্ক হোন।
এরপর হুসাইন (রাঃ) তাকে বলেন, আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন। আল্লাহ যে বিষয়েরই সিদ্বান্ত করেন তা অবধারিত।
তখন আবু বকর বললেন, ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন, আমরা আল্লাহর কাছে আবু আবদুল্লাহর শাহাদতের সওয়াব আশা করি।

১১. হযরত আবদুল্লাহ বিন জাফর
——————————
হযরত আবদুল্লাহ বিন জাফরঃ (রা) তাঁর কাছে পত্র লিখেন। এতে তিনি তাকে ইরাকবাসীদের ব্যাপারে সতর্ক করেন,এবং তাদের অভিমুখে রওনা না হওয়ার জন্য আল্লাহর দোহাই দেন।

১২. হুসাইন (রাঃ) এর বৈমাত্রিয় ভাই মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যা
—————————————–
হযরত হুসায়ন বনী আবদুল মুত্তালিবের ক্ষুদ্র একটি দলকে তাঁর কাছে নিয়ে আসার জন্য লােক পাঠালেন। এদের সংখ্যা ছিল নারী পুরুষ মিলে উনিশ জন। এদের মাঝে তাঁর ভ্রাতা কন্যা ও স্ত্রীগণ ছিলেন। এ সময় মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যা তাদেরকে অনুসরণ করে আসলেন এবং হযরত হুসায়নকে পবিত্র মক্কায় পেলেন। তিনি তাঁকে পরামর্শ দিলেন।

এ সময় তাঁর (ইরাকের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। কিন্তু হযরত হুসায়ন (রা) তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। তখন মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যা তাঁর সন্তানদের আটকে রাখলেন এবং তাদের একজনকেও পাঠালেন না। ফলে হযরত হুসায়ন (রা) তাঁর প্রতি মানােকষ্ট পেলেন এবং তাঁকে বললেন, আমি আক্রান্ত হব এমন কোন স্থান থেকে তুমি কি তােমার নিজের সন্তানদের আটকে রাখবে? তখন তিনি বললেন,
وما حاجتي إلى أَنْ تُصَابَ وَيُصَابُونَ مَعَكَ؟ وَإِنْ كَانَتْ مُصِيبَتُكَ أَعْظَمَ عِنْدَنَا مِنْهُمْ؟
এর কী প্রয়ােজন আছে যে, আপনি আক্রান্ত হবেন আর সাথে তারাও আক্রান্ত হবে? যদিও আপনার আক্রান্ত হওয়ার বিপদ আমাদের কাছে তাদের আক্রান্ত হওয়ার তুলনায় গুরুতর।

এছাড়াও আরও অসংখ্য সাহাবি, তাবেঈরা তাকে কুফায় যেতে বাধা দিয়েছিলেন।

সুতরাং এক্ষেত্রে এমন কথা বলা মোটেও ন্যায় সঙ্গত নয় যে, হুসাইন রা.-এর কুফায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল বাতিলের বিরুদ্ধে হকের লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত। এমনভাবে বললে সকল সাহাবীকে বাতিলপন্থি প্রমান করা হয়। কারন প্রায় সকল সাহাবীসহ গোঁটা মুসলিম বিশ্ব, ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, ইয়াজিদকে বাইয়াত দিয়ে ফেলেছিল। তবে কি সাহাবীরা বাতিলের পথ গ্রহণ করেছিলেন?
দ্বিতীয়ত এটা যদি বাতিলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম হয়ে থাকে তবে সাহাবীরা তাঁকে বাধা দেয়া তো দূরের কথা, সকলেই তার দলে যুক্ত হওয়া উচিৎ ছিল। সাহাবীরা কি এতো নিচু মানসিকতা লালন করতেন যে তাঁকে সঙ্গ না দিয়ে উলটো হক প্রতিষ্ঠা করতে বাধা দিয়েছিলেন? হুসাইনও (রা.) কি এতটাই কাপুরুষ ছিলেন যে তাঁকে হক প্রতিষ্ঠার জন্য শত শত চিঠি পাঠিয়ে ডেকে আনতে হল, নিজে থেকে হক প্রতিষ্ঠার গরজ অনুভব করলেননা?

আসলে প্রকৃত কথা হল এই যে, কুফাবাসির অনবরত চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ভেবেছিলেন তাদের নিয়ে ইয়াজিদকে হটিয়ে খেলাফতকে পুনরায় শুরা ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা বোধ হয় সম্ভব যা নিঃসন্দেহে অধিকতর বিশুদ্ধ পদ্ধতি। এর মানে এই নয় যে, বংশানুক্রমিক শাসন (রাজতন্ত্র) সম্পূর্ণরূপে নাযায়েজ।
একারনেই হুসাইন রা. কুফাবাসির প্রতারণার কথা অবগত হওয়ার পর মক্কায় ফিরে আসতে চেয়েছিলেন যেমনটি আমরা ইবনে যিয়াদের বাহিনীর কাছে তার দেয়া ৩টি প্রস্তাবে দেখতে পাই। যদিও ইবনে যিয়াদ প্রস্তাবগুলো মেনে না নেয়ায় শেষ পর্যন্ত তা যুদ্ধে রুপ নেয়।
সুতরাং রাজতন্ত্র যদি সম্পূর্ণরূপে অবৈধ হত তবে উনি জীবন দিয়ে হলেও ফিরে আসার কথা চিন্তাও করতেন না। সাহাবীরাও তাঁকে বাধা না দিয়ে বরং সবাই তার সঙ্গে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামত। সুতরাং আমাদের কথাবার্তা ও চিন্তা চেতনায় ভারসাম্যতা বজায় রাখা অতি জরুরী।
আমাদের এমন কথা বলা উচিৎ নয়, যার দ্বারা সকল সাহাবীর চিন্তাধারাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। অবশ্য আপনি যদি শিয়া হয়ে থাকেন তবে ভিন্ন কথা! কারন শিয়ারা অধিকাংশ সাহাবীকেই মুনাফেক ও কাফের মনে করে।
আপনারা যারা বলছেন বংশানুক্রমিক শাসন (রাজতন্ত্র) সম্পূর্ণরূপে হারাম। আপনাদেরকে কে এই অধিকার দিয়েছে ইসলামের বিগত ১৩শ বছরের ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করার?
উমাইয়া, আব্বাসী ও উসমানী খেলাফতসহ বিগত ১৩শ বছরে সকল মুসলিম সাম্রাজ্যই ছিল রাজতন্ত্র তথা বংশানুক্রমিক শাসন। এ দীর্ঘ সময়ে অতিক্রান্ত হয়েছে কত সাহাবী, তাবেঈ, তাবে তাবেঈ, চার ইমামসহ অসংখ্য উলামা, ফুকাহা। কেউই এর বিরুদ্ধে হারাম ফাতওয়া জারি করেননি। বিংশ শতাব্দীতে এসে পাশ্চাত্য থেকে গনতন্ত্র আমদানী করার পর আপনাদেরকে কে এই অধিকার দিল রাজতন্ত্রকে চূড়ান্তভাবে হারাম ফতওয়া দিয়ে প্রকারন্তরে আমাদের ১৩শ’ বছরের গৌরবের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করার?

✍ মাওলানা মহবুবুর রহমান
পূর্ব-কানিশাইল, করিমগঞ্জ।
অধ্যক্ষ,আরএমএস,আসাম।
📱9613432390
Email: rahmanmehbub27@yahoo.com