ঢাকাThursday , 19 August 2021

আশুরার রোজার ফজিলত ও গুরুত্ব

Link Copied!

সময় তার নিজের গতিতে বয়ে যায়। সব কিছু শুরু হয় এবং শেষ হয়ে যায়। দিন যায় রাত আসে, রাত যায় দিন আসে। এভাবে শেষ হয় সপ্তাহ, মাস ও বছর। এ সময় ও কালের প্রবাহ কখনো থেমে থাকে না। আপনগতিতে চলে সম্মুখপানে অবিরাম। সদাসচল সময়ের স্রোতধারা। বর্তমান বিলীন হয়ে যায় অতীতের বুকে। ভবিষ্যৎ ঠাঁই পায় বর্তমান প্রাঙ্গণে। আগমন ঘটে নতুনের, প্রস্থান ঘটে পুরানের। জগতে এটা চরম সত্য। জাগতিক এই নিয়মেই আমাদের সবার জীবন থেকে চলে গেল একটি বছর। হিজরিবর্ষ ছিটকে পড়ল মহাকালের অসীম গর্ভে। মিশে গেল সময়ের আবর্তে। শুরু হলো একটি নতুন বছর। তথা আরবী বা হিজরিবর্ষ। হিজরিবর্ষের প্রথম মাস মহররম। শব্দটি আরবী। যার আভিধানিক অর্থ সম্মানিত। বাস্তব বিচারেও এ মাস প্রতিটি মুমিনের দৃষ্টিতে সম্মানিত।

পবিত্র ইসলামের আলোকিত বিশ্বাস ও বিধিবিধানকে আল্লাহর জমিনে পরিপূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের মাতৃভূমি পর্যন্ত ত্যাগ করেছিলেন, সহ্য করেছেন কত জুলুম-নির্যাতন। পশ্চিমাকাশের এক ফালি মহররম চাঁদ চির জীবন্ত ত্যাগ ও আদর্শের সেই বার্তায় আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে যায় প্রতিটি মুমিনের হূদয় অনুভবে।

অধিকন্তু পবিত্র এ মাস আলোকিত হয়েছে প্রিয় সরদারে দুআলম রাসুলে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বরকতপূর্ণ সিয়াম সাধনায়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছে, ‘রমজানের পর সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের।’ আশুরার দিনের রোজা এক বছরের কাফফারা। হজরত আবু কাতাদাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘আরাফার দিনের রোজা এ বছরে ও আগামী বছরের পাপের কাফফারা। আর আশুরার রোজা এক বছরের পাপের কাফফারা হবে।’ (মুসনাদে হুমাইদি-৪৩৩) হাদিসে বর্ণিত মহররমের রোজাটি মূলত দশই মহররম তথা আশুরার রোজা। মহররমের মর্যাদা ও বরকতের উৎস এ রোজাটিই।

হজরত আবু কাতাদাহ (রা.) এর বর্ণনায় আছে, আশুরার রোজা সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেসা করা হলে তিনি বলেন, ‘আশুরার রোজা বিগত বছরের পাপসমূহ মোচন করে দেয়।’ ইসলামে আশুরার রোজার সূচনা কীভাবে হলো; এ সমর্কে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মত হলো, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, ‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরত করে মদিনায় এসে ইহুদিদের দেখলেন, তারা আশুরার দিনে রোজা রাখে। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এটা কিসের রোজা? তারা বললেন এটি একটি ভালো দিন। এ দিনে আল্লাহতায়ালা বনী ইসরাইলকে তাদের শত্রুর কবল থেকে পরিত্রাণ দিয়েছেন। তাই হজরত মুসা এ দিনে রোজা রেখেছেন।

তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি তো মুসাকে অনুসরণের ক্ষেত্রে তোমাদের চাইতেও অধিক হকদার।’ উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, কুরাইশরা জাহেলি যুগে আশুরার দিনে রোজা রাখত এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও রোজা রাখতেন। হিজরত করে মদিনায় আসার পরও তিনি এ রোজা রেখেছেন এবং মুসলমানদেরকেও রোজা রাখতে আদেশ দিয়েছেন। তারপর যখন রমজান মাসের রোজা ফরজ হলো, তখন তিনি ইরশাদ করলেন, যার খুশি আশুরার রোজা রাখবে আর যার খুশি ছেড়ে দিবে।

বোঝা গেল, আশুরার রোজা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় থাকতেই রাখতেন। তবে মদিনায় এসে যা হয়েছে তা হলো সাহাবিদেরকেও রাখতে বলেছেন। তাই এটাকে পূর্ব আমলেরই নবায়ন বলা যায়, সূচনা নয়। আশুরার সুন্নত রোজা দুটি। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আশুরার দিনে রোজা রাখেন এবং অন্যদেরও রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করেন, তখন সাহাবিরা অবাক হয়ে বলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ইহুদি-নাসারারা তো এই দিনটিকে বড়দিন মনে করে। (আমরা যদি এই দিনে রোজা রাখি, তাহলে তো তাদের সঙ্গে সামঞ্জস্য হবে।

তাদের প্রশ্নের উত্তরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তারা যেহেতু এদিন একটি রোজা পালন করে) আগামী বছর ইনশাআল্লাহ আমরা এই ১০ তারিখের সঙ্গে ৯ তারিখ মিলিয়ে দুইদিন রোজা পালন করব।’ (মুসলিম, হাদিস নং-১১৩৪) অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমরা আশুরার রোজা রাখো। তবে এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের বিরোধিতা করত আশুরার পূর্বে অথবা পরে একদিনসহ রোজা রাখবে।’ (আল-জামিউস সাগীর হাদিস নং-৫০৫০) সুতরাং রোজা রাখার পদ্ধতি হলো, মহররমের নয় ও দশ তারিখ কিংবা দশ ও এগার তারিখ রাখা। এ বছর আশুরা বা ১০ মহররম হলো আগস্টের বিশ তারিখ শুক্রবার। সে হিসেবে ১৯-২০ আগস্ট কিংবা ২০-২১ আগস্টের রোজা হলো আশুরার রোজা।

আশুরার প্রকৃত ফজিলত ও গুরুত্ব বিশুদ্ধ হাদিসের আলোকে এতটুকুই যা, আলোচিত হলো। শিয়াদের শোক মিছিল ও মাতমের সঙ্গে এর কোনোই সম্পর্ক নেই। এমনিভাবে হালুয়া-রুটি বিতরণেরও কোনো ভিত্তি নেই। এসব গর্হিত কাজ পরিহার করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাতানো পদ্ধতিতে রোজা পালনের মাধ্যমে বরকতময় এ দিনের সুফল লাভ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। আল্লাহতায়ালা আমাদের সে তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষার্থী, জামিয়াতুন নূর আল কাসেমিয়া, উত্তরা-ঢাকা