ঢাকাTuesday , 1 June 2021

ফুলবাড়ীতে পাটের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা, স্বপ্ন দেখছেন কৃষক

Link Copied!

ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি:: কুড়িগ্রামে ফুলবাড়ীতে চলতি মৌসুমে পাটের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় পাট চাষিদের মূখে হাসি ফুঠেছে। পাটকে সোনালি আঁশ বলা হয়। পাট বাংলার ঐতিহ্য। এই শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের এক সফল ইতিহাস এবং মিশে আছে আমাদের নিজস্বতা। এদেশের অর্থনীতিতে বহু বছর ধরে স্বমহিমায় উজ্জ্বল ছিলো পাট শিল্প। সোনালি আঁশ ও রূপালি কাঠি উভয়ই বেশ সম্ভাবনাময় দিক। আমাদের আদমজী পাটকল ছিলো বিশ্বের বৃহত্তম পাটকল হিসাবে স্বীকৃত। বিশ্বের অন্যান্য পাট উৎপাদনকারী দেশের চেয়ে বাংলাদেশের পাট ছিলো উন্নত ও অধিক সমাদৃত।

সুদূর প্রাচীন কাল থেকে আমাদের পাট শিল্প ছিলো অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। একসময় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান হাতিয়ার ছিলো এই পাট। এমনকি স্বাধীনতার পরেও দুই এক বছর আমাদের পাট শিল্পের গৌরব ছিল অক্ষত।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকের মাঠে মাঠে দু-চোখ জুড়ানো সবুজের সমারোহ। উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় সবুজ পাতা দোল খাচ্ছে মাঠের পর মাঠ। সেই সাথে এখন দোল খাচ্ছে কৃষকের সোনালী স্বপ্ন।

যেন মাঠ জুড়ে সবুজ রঙে সাজিয়ে তুলিছে প্রকৃতির অপরুপ শোভা। পাটের বাজার মূল্য ভাল পাওয়ায় কৃষকরা ব্যাপক হারে এ বছর পাট চাষ করেছেন। আবহাওয়া অনুকুল থাকায় গত বছরের চেয়ে পাটের বাম্পার ফলনের আশা করছেন এবং এবারও ভালো দামের স্বপ্ন দেখছেন প্রান্তিক চাষিরা।

বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার পাট চাষি মিজানুর রহমান জানান, এবছর প্রায় ৬ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছি। আবহাওয়া অনুকুল থাকায় এ বছর পাটের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। আশা করছি এবছরও পাটের ভালো দাম পাবো।

নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের কৃষক মন্ডল মিয়া জানান, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগীতায় এবছর আড়াই বিঘা জমিতে পাট চাষবাদ করেছি। পাট চাষে খরচ কম লাভ বেশি। তবে আশা করছি এবার পাটের ফলন ভালই দেখা যাচ্ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুর রশিদ জানান, এ বছর উপজেলা কৃষি বিভাগ ৭৪৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্য মাত্রা তাদের উৎপাদিত স্বপ্নের সোনালী ফসল ঘরে তুলতে পারবে। আমরা জানি পাট শিল্প হলো বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ভারী শিল্প, যা ব্রিটিশ শাসনামলে এবং পাকিস্তানি আমলে একক বৃহত্তম শিল্প। বর্তমান বিশ্বের পাট ও পাটজাত দ্রব্যের বৈদেশিক রপ্তানি আয়ের বৃহদাংশই বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা মোট বিশ্ববাজারের প্রায় ৬৫%।

পাট বরাবরই বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় খাত। কালের বিবর্তনে আধুনিকতার পরশে তার গৌরব অনেকটা মলিন হয়ে গেছে। প্লাস্টিক, পলিথিনের ব্যাপক ব্যবহার মাটি, প্রাণী, উদ্ভিদের চরম ক্ষতি করছে। বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১ ট্রিলিয়ন পলিথিন ব্যবহার করা হয় যা পরিবেশ দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। তাই বর্তমানে পরিবেশ সচেতনতার জন্য আবারও এই সম্ভাবনাময় পাট শিল্পের পুনর্জাগরণ শুরু হয়েছে। কাঁচা পাট, সোনালি আঁশ, পাটকাঠি, পাটজাত পণ্য সবই একেকটা সম্ভাবনার হাতছানি। পাট থেকে তৈরি জুট জিওটেক্সটাইল বাঁধ নির্মাণ, ভূমিক্ষয় রোধ, পাহাড় ধস রোধে ব্যবহৃত হয়। আমাদের দেশের উন্নত পাট এখন বিশ্বের অনেক দেশে গাড়ি নির্মাণ, কম্পিউটারের বডি, উড়োজাহাজের পার্টস তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।

তাছাড়া ইনস্যুলেশন, ইলেকট্রনিক্স, মেরিন ও স্পোর্টস শিল্পেও বহির্বিশ্বে বেশ পরিচিত বাংলাদেশের পাট। পাটকাঠি থেকে তৈরি চারকোল খুবই উচ্চমূল্যের যা দিয়ে আতশবাতি, কার্বন পেপার, ওয়াটার পিউরিফিকেশন প্লান্ট, ফটোকপিয়ার মেশিনের কালি, মোবাইল ফোনের ব্যাটারিসহ নানান জিনিস তৈরি করা হয়।

আবার এই অ্যাকটিভেটেড চারকোল থেকে অনেক প্রসাধন সামগ্রীও তৈরি করা যায়। পরিবেশবান্ধব ও যথাযথ উপযোগীতার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা খাদ্যশস্য মোড়কীকরণে পাটের থলে ও বস্তা ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। বর্তমান বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৫০০ বিলিয়ন পাটের ব্যাগের চাহিদা রয়েছে। পরিবেশ সচেতনতার জন্য এই চাহিদা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম দুইমাসেই প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ ৪০ হাজার ডলারের পাটের বস্তা, চট ও থলে রপ্তানি হয়েছে। তাই এই দিকটাতে সচেতন দৃষ্টি দেওয়া হলে তা আমাদের অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখতে পারে। আবার পাট দিয়ে তৈরি শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, লুঙ্গি, ফতুয়া, পাঞ্জবি, শোপিস, ওয়ালমেট, নকশিকাঁথা, পাপোশ, জুতা, শিকা, সুতাসহ নানান পাটজাত পণ্য যেমন আকর্ষণীয় তেমন পরিবেশবান্ধবও।

২০২০-২১ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পন্য রপ্তানি থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার যা আমাদের অর্থনীতির উজ্জ্বল দিক নির্দেশ করে। খাদ্য হিসেবে পাটের উপযোগিতাই সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। কচি অবস্থায় পাটের পাতা আমাদের দেশে বেশ উপাদেয় শাক হিসেবে পরিচিত। শুকনো পাট পাতা অর্গানিক চা উৎপাদনও শুরু হয়ে গেছে। এবারের ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় এই পানীয় মানুষের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। বিশ্ববাজারে তার পরিচিতি তুলে ধরতে পারলে তা চায়ের বিকল্প সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারে।

আমাদের সংস্কৃতির সাথে পাট শিল্পের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ। এই শিল্প আমাদের অর্থনীতির চাকার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এদেশের লক্ষ লক্ষ কৃষকের অবলম্বন এই পাট। কর্মসংস্থান, অর্থ উপার্জন, দারিদ্র্য বিমোচন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সর্বোপরি এই দেশের ঐতিহ্য ও নিজস্বতা রক্ষায় পাট শিল্পের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আধুনিকতার পদতলে নিষ্পেষিত যখন পুরো পৃথিবী, দূষণের ফলে বিশ্ব পরিবেশ যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তখন পাট শিল্পের যথাযথ ব্যবহার আমাদের বাঁচাতে পারে অদূর ভবিষ্যতের অনেক ভয়াবহতা থেকে। এ শিল্প আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার।

এ শিল্প বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের পরিচায়ক। সরকারের সজাগ দৃষ্টি ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করতে হবে আমাদের এই শিল্পকে এবং ফিরিয়ে আনতে হবে আমাদের গৌরবান্বিত ঐতিহ্য, নিজস্বতার ধারক এই পাট শিল্পকে।