ঢাকাWednesday , 16 December 2020

বিজয়ের দিনও বন্দি ছিল বঙ্গবন্ধুর পরিবার

Link Copied!

 

 

একা’ত্তরের ১৬ ডিসেম্ব’রেও যারা ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রাস্তা দিয়ে যেতেন, তাদে’রই হত্যার চেষ্টা করত পাকি’স্তানি সেনারা

বা’ঙালি জাতি’র বিজ’য়ের দিন ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সারাদে’শের মুক্তাঞ্চলে আনন্দের বন্যা বইলেও রাজধা’নীর ধানম’ন্ডিতে হানাদা’রদের হাতে বন্দি বঙ্গ’বন্ধু পরিবারের সদস্য’দের মৃত্যুর প্রহর গুনতে হয়েছিল। সেই সময় ধানম’ন্ডির ১৮ নম্বর রোডের বাড়িতে বঙ্গব’ন্ধুর পত্নী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতু’ন্নেছা মুজিব, তার কন্যা শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, পুত্র শেখ রাসেল ও শেখ হাসি’নার শিশু স’ন্তান জয়সহ অনেকে বন্দি ছিলেন।

২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকি’স্তানি সেনা’বাহিনী বাঙা’লি জাতি’র পিতা বঙ্গ’বন্ধু শেখ মুজি’বুর রহমা’নকে তার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে গ্রেফ’তার করে নিয়ে যায়। অপরদিকে তার পরিবা’রকে বন্দি করে রাখা হয় ধানম’ন্ডির ১৮ নম্ব’র সড়কের ২৬ নম্বর বাড়িতে। ওই বাড়ির ছাদে পাকি’স্তানি বাহি’নী দুদিকে দুটো বা’ঙ্কার করে মেশিনগান বসিয়ে’ছিল। এছাড়া আরে’কটি বাঙ্কার গ্যারে’জের ছাদে করা ছিল।

স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গ’বন্ধুর কন্যা বর্তমান প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষ্যে, পাক-হানাদার বাহি’নীর আত্মস’মপর্ণের দিন রাস্তায় রাস্তায় মানু’ষের ঢল, বিজয়ো’ল্লাস। আমরা বাড়িতে বন্দি কয়টি প্রাণী মৃত্যুর প্রতী’ক্ষায় যেন প্রহর গুন’ছি। আম’রা নরকে বসে দেখছি হায়ে’নার শেষ কামড়।

সেই ১৬ ডিসে’ম্বরেও তাদের দেখতে যারা ওই রাস্তা দিয়ে যেতেন তাদে’রই হত্যার চেষ্টা করত পাকি’স্তানি সেনারা। এর মধ্যে কয়েকজন প্রাণও দেন। আর এসব নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চলেছে ২৬ নম্বর বাড়ি থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে। পরে ১৭ ডিসে’ম্বর মিত্র বাহিনী বাড়ি’টি ঘিরে ফেলে উদ্ধা’র করে বঙ্গবন্ধুর পরি’বারকে।

প্রধান’মন্ত্রী শেখ হাসি’নার লেখা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ গ্রন্থে উঠে এসেছে সেসময়কার রুদ্ধশ্বাস এসব ঘটনার বর্ণনা।
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্ব’রের স্মৃতিচারণ করে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘গতকাল থেকে বারবার ঘোষণা শুনছি আজ রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান হবে। চারদিকে ভোর থেকে হৈ চৈ, জয় বাংলার জয়ধ্বনি। আমরা ধানম’ন্ডি ১৮ নম্বর রোডের এই বাড়িতে গত আট মাস ধরে বন্দি। সবসময় ঘরের ভেতর থাকতে হয়। বাইরের ধ্বনি ভেসে এলেই রাসেল পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে চিৎকার করে ওঠে “জয় বাংলা” বলে।’

‘জানি আমাদের এই কণ্ঠধ্বনি এই বন্দিশালার দেয়াল ভেদ করে রাজপথের আনন্দের উল্লাসের স্রোতে মিশবে না; তবু কি মনের এই স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ চেপে রাখা যায়? সে যেন আজ পাগলপারা নদী! মনের সব আকাঙ্ক্ষা-ইচ্ছে সেদিন বিজয় মিছিলে ছোটাতে গিয়ে বারবার সেই বন্দিশালার চার দেয়ালের আঘাতে ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। চোখের কোণ অশ্রুভরা, রাসেলের চাপা আনন্দ। এই বিজয় দিবস কত আকাঙ্ক্ষিত আমাদের জন্য। রাস্তার শেষ মাথায় সাত মসজিদ রোডে। সেখান থেকেই বোধহয় মিছিলের মানুষের ধ্বনি ভেসে আসছে। আমরা এই বন্দিশালা থেকে কখন মুক্ত হবো– কখন ওই বিজয় মিছিলে যাব সবার সাথে? আমরা কি পারব মুক্ত বাতাসে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে? স্বাধীনতা আমার, আমার স্বাধীনতা। স্বাধীনতার স্বাদ কি আমরা পাব না?’

বাঙালির বিজ’য়ের আগে হানাদা’রদের নির্মমতার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘…দীর্ঘ নয়টি মাস দেশটা শত্রুর কবলে ছিল, শুধু আর্তচি’ৎকার, গুলির শব্দ, আর মৃত্যুর শোক মানুষের জীবনকে অর্ধমৃত ও আতঙ্কগ্রস্ত করে রেখেছিল। সে যেন এক দুর্বিষহ অবস্থা। নিশুতি রাতের কুকুরের করুণ কান্না, জলপাই রং মিলি’টারি জিপ বা ট্রাকের আও’য়াজ। হঠাৎ করে গুলির শব্দ বা গ্রেনেড ফো’টার আও’য়াজ, বস্তির ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে পোড়ানো হচ্ছে, তার হালকা আভা ও ধোঁয়ায় আ’কাশ ছেয়ে যাওয়া; অস’হায় নারী পুরুষের আর্তচিৎকার– এই তো ছিল ঢাকা শহরের প্রতিদিনের দৃশ্য।’

‘সমগ্র দেশটা’ই ছিল এক বন্দিশালা। এরই মাঝে জীবনের ধ্বনি যেন পাওয়া যেত, যখন শোনা যেত কোনো মুক্তিযোদ্ধার গুলি বা বোমার শব্দ, মিলিটারি মারার খবর। তাদের যেকোনো আক্রমণ বা গ্রেনেড ফোটার বিকট শব্দ হলে শত্রু’পক্ষ সন্ত্রস্ত হতো মনে হতো আমরা বেঁচে আছি, বেঁচে থাকব, আমাদের অস্তি’ত্ব এখনো আছে। অমৃতের বরপুত্র এই মুক্তি’যোদ্ধারা আমাদের যেন নতুন করে জীবনদান করে যেত!’
বিজয়ের চূড়ান্ত লগ্নেও বঙ্গ’বন্ধু পরিবারের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় থাকার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘গত কয়েক দিন থেকে সীমাহীন দুর্দ’শায় কাটছে আমাদের। মৃত্যুর মুখোমুখি যেন। যখন-তখন মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে ওরা হাজির হতে পারে। সারাদিন, সারারা’ত এক অদ্ভুত অনুভূতির মধ্য দিয়ে কাটাতে হচ্ছে। আব্বা কি বেঁচে আছেন? কোথায় কী অবস্থায় আছেন কিছুই জানি না। কামাল, জামা’ল, নাসের কাকা, মনি ভাইসহ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, আওয়ামী লীগের, ছাত্রলীগের সবাই তো মুক্তিযুদ্ধে। কে আছে, কে নেই, কোনো খবর জানা নেই। যদিও এই বন্দিদশার মধ্যেই মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কিছু যোগাযাগ ছিল, কয়েকদিন থেকে তাও একেবারেই বিচ্ছিন্ন। চারদিকে এত প্রতিধ্বনি-রেডিওতেও শুনেছি দেশের প্রায় সব এলাকা স্বাধীন, মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে।’

‘শেখ মুজিব আমা’র পিতা’ বইয়ের প্রচ্ছদ এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার কন্যা শেখ হাসিনা
‘ভারতীয় বাহিনীর সৈন্যদের সাথে তারা এখন ঢাকার পথে মার্চ করে চলেছে। আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী, ছাত্রলীগের সাথীরা কে কোথায় কী অবস্থায় রয়েছে জানি না।’

বি’জয়ের দিনও বন্দি থাকার দুঃসহ অ’নুভূতি বর্ণনায় শেখ হাসি’না লিখেছেন, ‘…আজ এসেছে বিজ’য়ের দিন। কিন্তু হায়! আমরা তো রুদ্ধদ্বার, মুক্ত’প্রাণ!’

‘আমরা যে বাড়ি’টাতে বন্দি ছিলাম তার ছাদের উপর দুদিকে দুটো বাঙ্কার করে মেশিনগান বসা’ন হয়েছে। এছাড়া আর একটা বাঙ্কার গ্যারে’জের ছাদে করা হয়েছে। বাগানের মাটি কেটে ট্রেঞ্চ খোদা হয়েছে। দিনরাত গুলির আও’য়াজ। যখন বিমান আক্রমণ হয় তখন সব সৈন্য ট্রেঞ্চে ঢুকে যায় এবং বাঙ্কা’রে গিয়ে দাঁড়ায়। কেবল আমরা যারা বন্দি আমা’দের মৃত্যু প্রতীক্ষায় প্রহর গুনতে হয়। চার মাসের জয়কে নিয়ে হয়েছে অসুবিধা। বিছা’নায় শোয়ানো যায় না, গুলির আওয়া’জে কেঁপে ওঠে। রাসেল পকেটে তুলো রাখে। ওর কানে তুলো গুঁজে দেয়, যাতে গুলির আও’য়াজে কানের পর্দা ফেটে না যায়। রাসে’লকে নিয়ে হয়েছে আরও মুশকিল। বিমান আক্র’মণ শুরু হলেই সে ছুটে বারা’ন্দায় চলে যেতে চায় অথবা সোজা মাঠে যেতে চায় বিমান দেখতে। অনে’ক কষ্টে ওকে ধরে রাখতে হয়।

কিছুতেই বোঝা’নো যায় না। মা, রেহানা, আমি যে যখন পারি ওকে আ’টকে রাখতে চেষ্টা করি। ঘরের ভেত’রে মাদুর পেতে মাটিতে সকল’কে নিয়ে বসে জানালা দিয়ে বিমান যুদ্ধ দেখি। আর প্রতী’ক্ষায় থাকি কখন শত্রুমু’ক্ত হবে দেশ। এভাবেই কয়ে’কটি দিন আমরা কাটি’য়েছি।’

হানাদারদের আত্মস’মর্পণের আগে ঢাকার রা’স্তায় জনতার উল্লা’সের কথা তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু কন্যা লিখেছেন, ‘আজ পাক-হানাদার বাহিনী আত্ম’সমপর্ণ করবে।

সকাল ১১টা পর্যন্ত সং’বাদ পেলাম ঢাকায় মুক্তিবাহিনী ও মিত্র’বাহিনী ঢুকে গেছে। রাস্তা’য় রাস্তা’য় মানু’ষের ঢল, বিজয়ো’ল্লাস। আমরা বাড়ি’তে বন্দি ক’য়টি প্রাণী মৃত্যুর প্রতী’ক্ষায় যেন প্রহর গুনছি।’

‘ঢাকা শহর মুক্ত হবার স’ঙ্গে সঙ্গে অনেকেই গাড়ি নিয়ে বাসার সা’মনে দিয়ে যাতায়াত শুরু করল, অনেকেই আমা’দের খোঁজ-খবর নিতে বা বাড়িতে ঢুক’তে চেষ্টা করল। কিন্তু প্রহরী’রা কাউকেই প্রবেশ করতে দিল না। বরং দুপুরের পর থেকে ওই রাস্তা দিয়ে যারাই গাড়ি নিয়ে যাতা’য়াত শুরু করল তাদের ল’ক্ষ্য করে গুলি ছুঁ’ড়তে আরম্ভ করল। এ দিকে রেডিওতে সারেন্ডার করবার ঘো’ষণা শুনছি আর আমা’দের এখানে সম্পূ’র্ণ উল্টো ঘটনা ঘটছে। মা হাবিল’দারকে ডেকে বল’লেন, “তোমাদের নিয়াজী সারে’ন্ডার করেছে, তোমরাও করো”।’

‘ওর সো’জা উত্তর “নিয়াজী কর সকতা হ্যায়, হাম নেহি করেঙ্গে। হামা’রা পাস এতনা তাগত হ্যায় কে হাম এক ব্যাটালিয়ান কো রোক সকতা।” অর্থাৎ, নিয়া’জী সারে’ন্ডার করতে পারে কিন্তু আমরা করব না। আমাদের যে শক্তি আছে তা দিয়ে এক ব্যাটালি’য়ান সৈন্যকে বাধা দিতে পারব।’

বঙ্গবন্ধু পরি’বারকে বন্দি রাখা হানাদার বাহিনীর গ্রুপটি’র আচ’রণ তুলে ধরে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘তাদের গু’লি চালানো অব্যাহত রইল। নারায়’ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা সামসু’জ্জোহা গাড়ি নিয়ে ১৮ নম্বর রা’স্তায় প্রবেশ করতেই তার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হলো। তিনি আহ’ত হলেন। কোনোমতে গাড়ি নিয়ে রাস্তা পার হলেন।

তার সঙ্গে আর’ও কয়ে’কজন মুক্তি’যোদ্ধা ছিলেন। এরা যদি রাস্তা’র দুই প্রবেশমুখ বন্ধ করে দেয় তাহলে আর কোনো গা’ড়ি ঢুকতে পারে না। সেটা না করে যারাই আসছে তাদেরই ওপর মেশিনগানের গুলিবর্ষণ করে চলেছে। সকলেই জানে আমরা এখানে বন্দি। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর সকলেই ভাবছে আমরা মুক্তি পাব। কাজেই দেখা করতে আসছে। মনের আবেগ-উল্লাস তাদের এ পথে নিয়ে আসছে। কিন্তু এখানে যে পৈ’শা’চিক কর্ম’কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে তা অনে’কেই বুঝতে পারছেন না। আ’মরা ঘ’রের ভেতর নীরব সা’ক্ষী হয়ে সব দে’খছি। খবর পাঠাবারও উপায় নেই। ঘরে’র বাই’রেও যেতে দিচ্ছে না।

‘ইঞ্জি’নিয়ার হাতেম আ’লী সাহেব ৩২ নম্বর সড়কে আমা’দের পড়শি হিসে’বে দীর্ঘদিন বসবা’স করছেন। তাছা’ড়া তিনি আমা’দের দূর সম্প’র্কের আত্মী’য়ও হন।

পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘর থেকে বের হয়েই প্রথমে এই রাস্তায় আমাদের এক নজর দেখতে এসে’ছিলেন। গাড়ি যখন এই রাস্তায় ঢোকে, মনে দ্বিধা ছিল কিন্তু মনের আবেগ চেপে রাখতে পারে’ননি। ঠিক গেটের সামনে আসতেই ছাদ থেকে মুষলধারে মেশিনগানের গুলি ঝাঁ’কে ঝাঁকে পড়তে শুরু করল। ড্রাই’ভার তার জায়গায় মৃত্যুবরণ করল। হাতে’ম আলী সাহেবের স্ত্রীর হাতে গুলি লাগল। তার পুত্রবধূর মাথার চামড়ায় গুলি লাগল। পানি পানি বলে আর্ত’চিৎকার শুনে আম’রা ঘর থেকে বারান্দায় ছুটে আস’তেই আমাদের দিকে রাই’ফেল তাক করে ওরা “আন্দা’র যাও, কুছ নেহি হুয়া—ভেতরে যাও কিছু হয়নি” বলে আমাদের ভেতরে পাঠিয়ে দিল।

আশে-পাশের বাড়ি থেকে অনেকেই সাহা য্যের জন্য ছুটে আসতে চাইল। ছাদ থেকে সোজা গুলি চালাল, তার ওপর গাড়ি হঠাও বলে চিৎ’কার। গাড়ির ভে:তরের আরোহীরা কোনো মতে গাড়ি ঠেলে সরিয়ে নিয়ে গেল। ফোটায় ফো’টায় রক্ত রাস্তা’য় পড়তে লাগল। আমরা অস’হায় বন্দি, জানা’লা দিয়ে সব দৃশ্য শুধু দেখে গেলাম। কালে’র সাক্ষী হয়ে রইলাম।’

হানাদার বাহি’নীর আত্মসমর্পণের সময়কার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘রেডিওতে আত্মসম’র্পণের খবর শুনছি। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো। মিত্রবা’হিনী ভারত ও মুক্তিবাহিনীর পক্ষে জেনারেল অরোরা উপস্থিত থেকে পাকি’স্তানি সেনাবা’হিনীর জেনা’রেল নিয়াজী’কে আত্মসর্মপণ করালেন। রেসকো’র্সে স্বাধীন বাংলার পতাকা বিজয়ে’র স্বা’ক্ষর বহন করে উড়ল।’

এক ফ্রেমে বঙ্গ’বন্ধুর পরিবার
‘…কী আনন্দ, কী উল্লাস—চোখে অশ্রু, মুখে হাসি, কণ্ঠে জয় বাং’লা ধ্বনি প্রকম্পিত করছে ঢাকা শহর তথা গোটা বাংলাদেশকে। আর আমরা? আমরা নর’কে বসে দেখছি হায়েনার শেষ কামড়, শেষ উল্লাস।

আমাদের বন্দিশালা তখনো স্বাধীনতার স্বাদ থেকে বঞ্চিত, তার ওপর তখনো পাকিস্তানি পতাকা উড়ছে। সামনে’র রাস্তা দিয়ে কাদে’রিয়া বাহিনী’র এক’টি খোলা জিপ ব্যা’নারসহ স্লোগা’ন দিতে দিতে যাচ্ছিল। উপর থেকে মেশিন’গানের গুলি ছুঁড়ল ওরা।

রাস্তা থেকে পাল্টা গুলি এল। তাই দেখে রেহানা মুক্তিবাহিনী, মুক্তিবাহিনী বলে জানালায় উঠে হাত’তালি দিতে শুরু করল আর জয় বাংলা বলে স্লো’গান দিল। তাড়া’তাড়ি ওকে বকা দিয়ে জানালা থেকে নামালাম। কখন ক্রস’ফায়ারে পড়ে যায় ঠিক নেই। রাসেল, খোকা কাকা, রেহানা, মা ও আমি জয়কে পালা করে কোলে নিয়ে সময় কাটাচ্ছি।’

‘ওদিকে বুয়া বৃদ্ধা মানুষ। কানেও শো’নে না ভালো করে, তার প্রশ্নের শেষ নেই। রমা ও আবদুল ওরাও বয়’সে কম। কখন বাসার বাইরে যেতে পারবে, মিছি’লে শরিক হতে পারবে সেই প্রতী’ক্ষায় ছটফট করছে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসছে। ওদের গোলা’গুলিও বাড়ছে। এই রা’স্তা দিয়ে যে কয়টা গাড়ি যাচ্ছে তাতেই সরাসরি গুলি করেছে। একটা গাড়ি’তে গুলি করবার সঙ্গে সঙ্গে “বাবারে” বলে চিৎকার শুনলাম।

গাড়িটা বাসা’র কোনায় থেমে গেল। তখনো বাতি জ্বল’ছে। বেশ কিছু’ক্ষণ গুলি চালাবার পর ওরা চিৎকার শুরু করল “বাত্তি বন্ধ কর, বাত্তি বন্ধ কর” অর্থাৎ বাতি বন্ধ কর। কিন্তু কে করবে? যে করবে তাকে তো গুলি করে হত্যা করেছে, সে খেয়াল নেই। সারারাত গাড়িটা বাতি জ্বালান অবস্থায় পড়ে থাকল।

একের পর এক গাড়ি এসে’ছে আর গুলি চালিয়ে মানু’ষ হত্যা করছে। আমা’দের থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে এই নার’কীয় হত্যায’জ্ঞ চলছে। আম’রা বন্দি কয়টি প্রাণী শুনছি গুলি’র শব্দ আর আর্তচি’ৎকার। সা’রারাত এভা’বেই কাটল।’
‘খুব ভোরের দিকে গোলাগু’লি থামল। খব’র নিয়ে জানলা’ম হাবি’লদার সা’ব নিন্দ পড়া অর্থাৎ ঘুমু’চ্ছেন।’

বি’জয়ের একদিন পর ১৭ ডিসেম্বর মুক্তি পায় বঙ্গবন্ধুর পরিবার। সেই বিষ’য়টি প্রকাশ পায় শেখ হাসি’নার লেখায়, ‘আজ ১৭ ডিসেম্বর। সারা’রাত গুলি চালা’বার পর একটু বিরতি। রমা এসে বলল, গেটে কয়েক’জন বিদে’শি সাং’বাদিক এসেছি’ল, পাকসে’নারা ওদের ঢুক’তে দেয়নি।

হাবিল”দারটা ঘুমু’চ্ছে তাই রক্ষে, নইলে ঠিক গুলি চালিয়ে দিত।’

‘এর মধ্যেই দেখ’লাম ভার’তীয় সৈন্যবা’হিনী বা’ড়িটা ঘিরে ফে’লেছে এবং পাক-সেনা’দের সারেন্ডার কর’বার জন্য চাপ দি’চ্ছে।

হাবিল’দারকে ঘুম থেকে তোলা হলো। সে কিছুতেই নমনী’য় হবে না। আমরা সব সামনের কা’মরায় জানা’লার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখান থে’কে গেট খুব কাছে, অনেক বাক’বিতণ্ডার পর পাক-সেনারা সারে’ন্ডার কর’তে রাজি হলো। তবে দু’ঘণ্টা সময় চায়। আমরা ভেতর থেকে প্রতিবাদ কর’লাম। মে’জর অশোক নেতৃ’ত্বে ছিলেন।’

‘তাকে চি’ক্কার করে বললাম, ওদের যদি দু’ঘণ্টা সময় দেয়া হয় তাহ’লে ওরা আমাদের হত্যা কর’বে। কা’জেই ওরা যেন কিছুতেই চলে না যায়। আমা’দের অনু’রোধে ওরা ওদের অব’স্থান নিয়ে থাকল এবং পাক-সেনা’দের আধ-ঘণ্টা সময় দিল।’

আত্ম’সমর্পণের সিদ্ধা’ন্তে হানাদার সেনা’দের ভীত-স’ন্ত্রস্ত হয়ে পড়ার বিষ’য়টি উল্লেখ করে শেখ হা’সিনা লিখেছেন, ‘এত দুঃখে’র মধ্যেও মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘট’না ঘটে যে হাসি চেপে রাখা যায় না। গেটে যে সে’ন্ট্রি দুজন ছিল ওরা দারুণ’ভাবে কাঁপ’তে শুরু করল। এদিকে আমার মা জানা’লা দিয়ে ওদে’রকে হুকু’ম দি’চ্ছেন। এর মধ্যে একজ’নের নাম ছিল পায়ে’ন্দা খা। মা ওকে নাম ধরে ডেকে সারে’ন্ডার করতে হু’কুম দিলেন। সে কাঁপতে কাঁপতে পাশের ট্রেঞ্চে ঢুকে গেল। ওর সাথী আগেই ট্রে’ঞ্চে ঢুকে বসেছিল।’

মুক্ত হওয়ার মুহূ’র্তের আনন্দ-অনুভূতি উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা লিখেছেন, ‘দরজা উন্মুক্ত। আমরা সব ঘর থেকে ছুটে বারান্দার চলে এলাম, ওরা সব অস্ত্র ফেলে দিয়ে একে একে সারেন্ডার করে গেল। মা স’ঙ্গে স’ঙ্গে আব’দুলকে হু’কুম দিলেন পাকি’স্তানি পতা’কা নামিয়ে ফেলতে। পতা’কাটি নামিয়ে মার হাতে দিতেই মা ওটা’কে নিচে ফেলে পা দিয়ে মা’ড়াতে শুরু করলেন। তার’পর ছিড়ে টুকরো টু’করো করে আগুন ধ’রিয়ে দিলেন। দুই পাশ থেকে জন’তার ঢল নামল।

সাংবাদি’করা ছুটে এলেন। মুক্ত হ’বার আ’নন্দের কা’ন্নায় আ’মরা সবা’ই ভেঙে পড়’লাম।’

‘চোখে অশ্রু, মুখে হাসি, কণ্ঠে জ’য় বাংলা ধ্বনি, মনের সব’টুকু আবেগ দিয়ে শ্লো’গান দিয়ে চল’ছি—আর প্রতীক্ষা’য় কাল গুনছি। কখন আপনজ’নদের কাছে পাব। এ প্রতীক্ষা কেবল আমা’র নয়, প্রতি’টি বাঙা’লির। তাদের নয়নের মণি মুজিবকে তারা কবে ফিরে পাবে। বিজ’য়ের এই আন’ন্দ তবেই তো পূর্ণতা লাভ করবে।’

উৎসঃ জাগো নিউজ২৪